স্মৃতিকথা

স্মৃতিকথা
স্মৃতিকথা ▸ মৌমিতা হোসেন

স্মৃতিকথা

স্মৃতিকথা

“পড়ালেখার কি অবস্থা? পাশ করবি তো মা?”

এস এস সি পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে ছোট খালুর কাছ থেকে এমন কথা শুনে ভীষণ লজ্জা পাই আমি। খালু এসেছিলেন পরীক্ষার জন্য উপহার নিয়ে। কলম, পেন্সিল সহ আরো কি কি যেনো নিয়ে এসেছিলেন। তার মেয়েও সেবার পরীক্ষার্থী ছিলো। সেই বছর আমার সাথে আমার মোট চার জন কাজিন আর এক মামা পরীক্ষা দিয়েছিলো। মোট পরীক্ষার্থী ছিলাম ছয় জন।

খালুর প্রশ্ন শুনে আমি চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কি উত্তর দেবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমাকে চুপচাপ দেখে আব্বু মুচকি হেসে বললো,”দেখা যাক কি করে। টেস্ট পরীক্ষায় তো মোটামুটি রেজাল্ট করলো। এখন বোর্ড পরীক্ষায় কি করবে কে জানে!”

খালুর মেয়ে ভালো ছাত্রী ছিলো। শুধু খালুর মেয়ে নয় বাকি সব কজনই ভালো ছিলো। সবাই ছিলো কমার্সের ছাত্র-ছাত্রী। শুধু আমি ছিলাম মানবিক এর ছাত্রী। আব্বুর কথা শুনে খালু তখন বলে,”একটু ভালো করে পড়ো মা। পাস কিন্তু করতেই হবে। নতুবা আবার পরীক্ষা দিতে হবে।”

কথাগুলো খালু খুব সাধারণভাবে বললেও আমার কাছে কথাগুলো কেমন যেনো বুকের ভেতর বিঁধে ছিলো। আর তার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম আব্বুর মলিন চেহারা দেখে। আমি তখন আব্বুর মলিন চেহারা দেখে চুপচাপ রুমে চলে আসি। মাগরিবের নামাজ পড়ে বই খুলে বসি। তবে সেদিন আমি একটুও পড়তে পারিনি। পুরোটা সময় মনের মধ্যে শুধু খালুর বলা কথাটাই ঘুরপাক খাচ্ছিলো।

এখানে একটা বিষয় বলে রাখি। আমার আব্বু বন বিভাগে চাকরি করতেন। তিনি ছিলেন ভীষণ সৎ মানুষ। আর আমরা মোট পাঁচ ভাইবোন। বছরে বছরে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলির কারনে আমার স্কুল পরিবর্তন হয় বেশ কয়বার। সবশেষে ঢাকায় এসে মিরপুরে একটা স্কুলে সপ্তম শ্রেনীতে ভর্তি হই। আমার চার ভাই বেশ ভালো ছাত্র ছিলো। কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই গনিত আর ইংরেজিতে কাঁচা ছিলাম। অবশ্য আমার জন্য কখনো সেভাবে কোন টিচারও রাখা হয়নি। যার জন্য এই দুই বিষয়ে কোন রকম পাশ করে করেই নবম শ্রেণীতে উঠেছিলাম।

নাইনে ওঠার পর একজন শিক্ষক রাখেন আমার জন্য। যার কাছে পড়ার পর থেকে গনিত আর ইংরেজি আমার কাছে অনেকটাই সহজ হয়ে গিয়েছিলো। তবে ছোটবেলার ঘাটতি পুরন হতে সময় লেগেছিলো বেশ।

আরেকটা বিষয় হলো সবাই যেমন নিজেদের নিয়ে ঢাকঢোল পেটাতেন আমার আব্বু আম্মু আমার পড়ালেখা নিয়ে কাউকে কখনো সেভাবে কিছু বলতেন না। অবশ্য সেভাবে বলার মত কখনো কোন রেজাল্ট তাদের দিতেও পারিনি।
__

পরীক্ষার আর মাত্র তিন দিন বাকি। পড়ছিলাম ঠিকই কিন্তু খালুর কথার জন্য সেল্ফ কনফিডেন্স কমে গিয়েছিলো অনেকটাই। আমার শিক্ষকের অবশ্য আমার ওপরে বিশ্বাস ছিলো। কিন্তু আমার মাঝে তখন সেল্ফ কনফিডেন্স জিরো। বারবার মনে হচ্ছিল পাশ করতে পারবো তো। অথচ তখন ঐ দুই বিষয়ের ওপরে আমার বেশ ভালোই আয়ত্তে চলে এসেছিলো।

পরীক্ষার তিন দিন আগে….
রাতে খাওয়া দাওয়া শেষে যখন পড়তে বসি তখন আব্বু একটা হরলিক্স এর কৌটা এনে আমার টেবিলে রাখেন। পড়ালেখার খোঁজ খবর নিয়ে যাওয়ার সময় মাথায় হাত রেখে ধরা কন্ঠে বলেন,”আম্মু পাশ করতে পারবি তো? একটু ঠিকমতো পড় আম্মু। অন্তত সেকেন্ড ডিভিশন যেনো আসে।”

সেদিন আব্বুর কথায় কি মেশানো ছিলো আমি জানি না। তবে আব্বু যাওয়ার পর অনেক কাদলাম। ভাবলাম সত্যি আমি এতো খারাপ ছাত্রী? পাশ করতে পারবো কিনা এতো খারাপ?

আমি চুপচাপ পড়া শুরু করলাম। পরীক্ষা শুরু হলো। আলহামদুলিল্লাহ ভালো হলো পরীক্ষা। আব্বু বললো,”পাশ আসবে তো আম্মু?”

আমি রোজ পরীক্ষা শেষে মৃদু হেসে শুধু বলতাম,”হ্যা আব্বু।”
__
রেজাল্টের দিন আল্লাহর নাম নিয়ে স্কুলে গেলাম। রেজাল্ট দেখলাম ফার্স্ট ডিভিশন এসেছে। দুটি লেটার। গনিতে আর ভূগোলে এক নাম্বারের জন্য লেটার মার্কস আসেনি। তবে তেমন কষ্ট পাইনি সেদিন। কারন ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি।

মার্ক শীট এনে দেখি ৭০৯ পেয়েছি। তখন স্টার মার্ক ছিলো ৭৫০ এ। যাক আমি খুশি ছিলাম। আমার বাসায় সবাইও ভীষণ খুশি।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো আমার বাকি পাঁচজন আত্মীয়ের একজনও ৭০০ ক্রস করতে পারেনি। দু’জন পেলো সেকেন্ড ডিভিশন। বাকিরা কোনরকম ফার্স্ট ডিভিশন। তবে আমি বা আমার পরিবার এসব নিয়ে কখনো তাদের ছোট করে কথা বলেনি।
___

এরপর আর আমাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কলেজে ভর্তি হয়ে বুঝলাম আমি পারবো। মন দিয়ে পড়া শুরু করলাম। টিচারদের প্রিয় হলাম। কলেজে ওঠার পরেও তারা আমাকে কথা শোনাতে ছাড়েনি। তাদের কথা ছিলো আমার খাতা দেখায় হয়তো ভুল করেছে। তাই হয়তো এতো মার্কস পেয়েছি। আমি এবারও কিছু বলিনি। শুধু পড়েছি। পরীক্ষা হলো। রেজাল্ট এলো ৭২৯ মার্কস পেয়েছি। এবারও আমার সব কাজিন খারাপ রেজাল্ট করলো। খারাপ বলতে যতোটা তারা নিজেদের নিয়ে গর্ব করতো তেমন কিছু হলো না। কমার্স থেকে সবাই খুব টেনেটুনে ফার্স্ট ডিভিশন পেলো।

আমার অবশ্য অন্যদের নিয়ে কখনোই তেমন মাথা ব্যথা ছিলো না। বিশেষ করে কারো দুর্বল দিক নিয়ে কথা বলা, তাকে কষ্ট দেয়া আমার ভীষণ অপছন্দ।

এরপর এলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধ। আব্বু আর বড় ভাইয়া একটা ভর্তি গাইড কিনে দিয়ে বললেন,”যদি গাইডটা পড়ে চান্স পাও তো ভালো নতুবা আবারো এই কলেজেই ভর্তি হতে হবে।”

আমাকে কোন এডমিশন কোচিং এ ভর্তি করানো হয়নি। শুধুমাত্র একটা গাইড বই পড়েছিলাম। আর শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ চান্স পেয়ে যাই। মনোবিজ্ঞান নিয়ে অনার্স মাস্টার্স শেষ করি।

উল্লেখ্য আমার সেই কাজিনদের কেউই কোথাও চান্স পায়নি। কোথাও বলতে কোন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কখনো কখনো মনে হয় সেদিন খালুর ওভাবে পাশের কথা জিজ্ঞেস করাতে ভালোই হয়েছে। কারন নাহলে আব্বু ওভাবে মন খারাপ করতেন না। আর আমার মাঝেও ভালো রেজাল্ট করার জেদটা আসতো না।

আগের মত আজও আমি কখনো কিছু নিয়ে অহংকার করিনা। কাউকে ছোট করে,কারো মনে কষ্ট দিয়ে কথা বলি না। নীরব থাকি আর ছোট ছোট অর্জনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে আরেকটু সামনে আগানোর চেষ্টা করি।

আর আসেপাশের মানুষ? তারা তো আজও কতো কি বলে। আমি শুধু চুপচাপ শুনি। আর অপেক্ষায় থাকি সঠিক সময়ের। কারন সময়ই সবাইকে সব কিছু শিখিয়ে দেয়। শিখিয়ে দেয় যে, চেষ্টা করলে সফলতা আসবেই।