খুঁড়িয়ে হাঁটা শহর

খুঁড়িয়ে হাঁটা শহর
গল্প ▸ সাখাওয়াত হোসেইন চৌধুরী

খুঁড়িয়ে হাঁটা শহর

খুঁড়িয়ে হাঁটা শহর

আমি ঠিক কোন দিনটায় জন্মেছিলাম, সেটা মনে নেই। কুকুরদের ক্যালেন্ডার থাকে না। আমাদের কাছে দিন মানে গন্ধ, রাত মানে শব্দ। তবু আমার মনে আছে প্রথম যে গন্ধটা আমি চিনেছিলাম, সেটা ছিল গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের ফেন এর। আর প্রথম যে শব্দটা চিনেছিলাম, সেটা ছিল ঢাকার রাতের বাসের ব্রেক কষার বিকট আওয়াজ।

আমি জন্মেছিলাম মিরপুরের একটা গলির পাশে। গলিটার একদিকে পুরনো পাঁচতলা বাড়ি, অন্যদিকে ড্রেনের ধারে টিনের দোকান। দিনের বেলায় সেখানে চা, সিগারেট, ডিম-টোস্ট বিক্রি হতো। রাতে দোকান বন্ধ হলে আমি আর আমার ভাইবোনেরা কার্টনের উপর গা এলিয়ে ঘুমাতাম।

আমার মা বলত, “মানুষকে বুঝতে শিখিস। সব মানুষ একরকম না।”

তখন বুঝতাম না। মানুষ তো মানুষই। দুটো পা, দুটো হাত, তাড়াহুড়া করে হাঁটে, মোবাইলে কথা বলে, মাঝে মাঝে খাবার ছুঁড়ে দেয়। আবার কখনও ইটও ছুঁড়ে দেয়।

বড় হতে হতে বুঝলাম, মা ঠিকই বলেছিল।

ঢাকার মানুষদের গন্ধও আলাদা।
রিকশাওয়ালাদের শরীরে ঘামের সঙ্গে ধুলো মেশানো গন্ধ।
অফিসফেরা মানুষদের শরীরে ক্লান্তি আর পারফিউমের গন্ধ।
স্কুলের বাচ্চাদের শরীরে রোদ আর চকোলেটের গন্ধ।
আর কিছু মানুষের শরীরে অদ্ভুত এক ঠান্ডা গন্ধ থাকে—যেন তারা ভেতর থেকে অনেক আগেই মরে গেছে।

আমি তখনও খুঁড়িয়ে হাঁটতাম না।

আমার চারটা পা-ই ঠিক ছিল। আমি দৌড়াতে পারতাম। রাতের বেলায় রাস্তার ওপর দিয়ে ছুটে যাওয়া বিড়ালদের পেছনে দৌড়াতাম। মাঝে মাঝে উত্তরা থেকে আসা বড় বাসগুলোর সামনে ঘেউ ঘেউ করতাম, যেন পুরো শহরটা আমার।

আমার একটা নামও ছিল।

“কালু।”

চায়ের দোকানের মালিক আমাকে ওই নামে ডাকত। যদিও আমি পুরো কালো ছিলাম না। বুকের কাছে একটু সাদা লোম ছিল। তবু মানুষেরা নাম দেয় নিজের ইচ্ছামতো।

চাচা কখনও কখনও বিস্কুট ছুঁড়ে দিত। বলত,
“এই কালু, ধর!”

আমি লাফিয়ে ধরতাম। তখন মনে হতো পৃথিবীটা খুব খারাপ না।

কিন্তু পৃথিবী বদলাতে বেশি সময় লাগে না।

সেদিন বিকেলে আকাশ খুব মেঘলা ছিল। মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে অদ্ভুত ভিড়। গাড়ির হর্ন, মানুষের চিৎকার, ধোঁয়া—সব মিলিয়ে মাথা ঝিমঝিম করছিল।

আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখি একটা ছোট মেয়ে, বয়স হয়তো পাঁচ কি ছয়, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। তার হাত থেকে আইসক্রিম পড়ে গেছে। সে চারপাশের গাড়ি দেখে ভয় পেয়ে গেছে।

মানুষজন তখনও ব্যস্ত। কেউ ফোনে, কেউ রিকশা থামাচ্ছে।

আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করব। শুধু দেখলাম একটা দ্রুতগতির মোটরবাইক মেয়েটার দিকে চলে আসছে।

আমি দৌড় দিলাম।

খুব দ্রুত।

আমার শরীরটা গিয়ে ধাক্কা খেল মেয়েটার গায়ে। মেয়েটা রাস্তার পাশে পড়ে গেল। কিন্তু আমি…

তারপর শুধু বিকট একটা শব্দ।

আর ভয়ংকর ব্যথা।

মনে হয়েছিল কেউ যেন আমার পায়ের হাড় ভেতর থেকে মুচড়ে ভেঙে ফেলেছে।

আমি চিৎকার করছিলাম। মানুষজন জড়ো হয়েছিল। কেউ বলল,
“আহারে!”

কেউ বলল,
“সরাও তো, রাস্তার মাঝে পড়ে আছে।”

কেউ ভিডিও করছিল।

মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের কাছে চলে গেল। তার মা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। একবারও আমার দিকে তাকাল না।

আমি তখন রাস্তার পাশে পড়ে কাঁপছিলাম।

সেই দিন থেকেই আমি খুঁড়িয়ে হাঁটি।

প্রথম কয়েকদিন খুব কষ্ট হয়েছিল। ক্ষুধার চেয়েও বেশি কষ্ট দিত মানুষের চোখ।

আগে যারা আমাকে “কালু” বলে ডাকত, তারা এখন দূর থেকে বলত,
“এই কুত্তাটারে সরাও তো।”

আমি ধীরে হাঁটতাম। পা মাটিতে পুরো রাখতে পারতাম না। মাঝে মাঝে হঠাৎ ব্যথা উঠত। তখন ড্রেনের পাশে বসে থাকতাম।

চায়ের দোকানের চাচা একদিন মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল,
“বাঁচাইতে গিয়া নিজেরে শেষ করলি রে।”

আমি তার কথার মানে পুরো বুঝিনি। কিন্তু তার গলায় একটা নরম গন্ধ ছিল—মায়ার গন্ধ।

সব মানুষ খারাপ না।
আবার সব মানুষ ভালোও না।

শীতের রাতে এটা সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়।

উত্তরার সেক্টর ৭-এর দিকে আমি মাঝে মাঝে চলে যেতাম। ওখানে রাস্তা একটু ফাঁকা। বড় বড় গাছ। অনেক ফাস্টফুডের দোকান। খাবারের গন্ধও বেশি।

একটা ছেলেকে আমি প্রায়ই দেখতাম। রাত করে বাসায় ফিরত। তার শরীরে বইয়ের কাগজ আর ক্লান্তির গন্ধ ছিল। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত।

সে আমাকে দেখলে বলত,
“কীরে ল্যাংড়া, আজ খাইছস?”

আমি লেজ নাড়তাম।

একদিন সে আমার পাশে বসে বলল,
“মানুষরে বেশি বিশ্বাস করিস না।”

আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মানুষের কথা পুরো বুঝি না, কিন্তু তাদের কণ্ঠের ওজন বুঝি।

ছেলেটার গলায় অনেক ক্লান্তি ছিল , সাথে ছিলো কিছু হারানোর বিষাদময় গন্ধ!

আমি ভাবতাম, মানুষরাও কি খুঁড়িয়ে হাঁটে?

বাইরে থেকে না দেখা গেলেও?

এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। ঢাকার রাস্তা তখন নদীর মতো। গাড়ির আলো পানিতে কাঁপছিল।

আমি একটা ফার্মেসির সামনে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তখন দেখি এক বৃদ্ধ লোক রাস্তাটা পার হতে গিয়ে পড়ে গেল।

তার হাতে বাজারের ব্যাগ। ওষুধ পানিতে ভেসে যাচ্ছে।

মানুষ পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ ছাতা বাঁচাতে ব্যস্ত, কেউ গাড়ি ডাকছে।

আমি ধীরে ধীরে গিয়ে বৃদ্ধ লোকটার পাশে দাঁড়ালাম। সে কাঁপছিল।

লোকটা আমার মাথায় হাত রাখল।
তার হাত ঠান্ডা ছিল।

সে বলল,
“তুইও একা?”

আমি উত্তর দিতে পারিনি। শুধু তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম যতক্ষণ না একটা ছেলে এসে তাকে উঠিয়ে নেয়।

সেদিন রাতে আমি বুঝলাম, একা মানুষের গন্ধ আলাদা।

খুব নিঃশব্দ।

আমার পায়ের ব্যথা সময়ের সঙ্গে কমেনি। বরং শীতে বাড়ত। মাঝে মাঝে হাঁটতে হাঁটতে থেমে যেতাম।

তখন মানুষ বিভিন্নভাবে তাকাত।

কেউ মায়া নিয়ে।
কেউ বিরক্তি নিয়ে।
কেউ ভয় নিয়ে।

একটা বাচ্চা ছেলে একদিন তার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
“মা, কুকুরটা খুঁড়িয়ে হাঁটে কেন?”

মা উত্তর দিয়েছিল,
“রাস্তার কুকুর। এমনই হয়।”

আমি অনেকক্ষণ কথাটা ভাবছিলাম।

“এমনই হয়।”

মানুষেরা খুব সহজে সবকিছুকে স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলে।

কষ্ট।
ক্ষুধা।
একাকীত্ব।
ভাঙা পা।

সবকিছু।

তবু আমি মানুষকে ঘৃণা করতে পারিনি।

কারণ মাঝে মাঝে কেউ একজন পানি দেয়।
মাঝে মাঝে কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
মাঝে মাঝে কোনও ছোট মেয়ে দূর থেকে বিস্কুট ছুঁড়ে দেয়।

এই ছোট ছোট জিনিসগুলোর জন্যই হয়তো আমরা বেঁচে থাকি।

একদিন সন্ধ্যায় আমি আবার সেই গোলচত্বরে গিয়েছিলাম যেখানে আমার পা ভেঙেছিল।

এখন সেখানে নতুন একটা ফুচকার দোকান হয়েছে।