ঘরটায় সন্ধ্যা নামার নিজস্ব একটা ভাষা আছে। যেটা শুধু যারা অপেক্ষা করতে জানে, তারাই বোঝে। জানালার বাইরে শিরীষ গাছের পাতাগুলো ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। দূরে কোথাও আজানের শেষ ধ্বনি বাতাসে ভেসে এসে থেমে গেল। ভেতরে একটি নরম হলুদ আলো। না উজ্জ্বল, না নিভু নিভু। ঠিক যেমন এই ঘরের আবহ, ঠিক যেমন দুজন মানুষের মাঝখানের নীরবতা।
মেয়েটির নাম অরণ্য।
সে বসে আছে খাটের এক পাশে। সাদা কাপড় পরা সহজ, শান্ত। পায়ের নিচে পাতলা চাদর, পুরোনো ফুলের নকশা। কিছু জায়গায় রং উঠে গেছে, কিছু জায়গায় এখনো স্পষ্ট। তার ডান পায়ে রুপালি নূপুর। ছোট ছোট ঘুঙুর। অনেকদিন শব্দ করেনি, আজ যেন কিছু বলতে চায়।
ছেলেটির নাম পূর্ণ।
সে দাঁড়িয়ে ছিল একটু দূরে। খুব কাছে গেলে এই মুহূর্তটা ভেঙে যাবে, এই ভয়টা তার ভেতরে।
ভালোবাসার কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো ছোঁয়ার আগে নিজেকেই সামলাতে হয়। পূর্ণ ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল অরণ্যের সামনে। মাথা সামান্য নিচু। চোখ তুলে তাকাতে সাহস পাচ্ছে না।
হাত বাড়ানোটা ছিল অদ্ভুত রকম সাবধানী। যেন হাত নয়, একটা অনুরোধ এগিয়ে যাচ্ছে। আঙুলের ডগা প্রথমে ছুঁয়ে ফেলল বাতাস, তারপর নূপুর। ধাতুর শীতল স্পর্শে পূর্ণের আঙুল কেঁপে উঠল। সে থেমে গেল।
এক সেকেন্ড,,
দুই সেকেন্ড,,,
এই থামাটুকু খুব দরকার ছিল। ভালোবাসার ভেতরেও তো থামতে জানতে হয়।
নূপুরটা সামান্য নড়ল। কোনো শব্দ হলো না, কিন্তু ঘুঙুরের ভেতরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো যেন হঠাৎ জেগে উঠল।
অরণ্য চোখ বন্ধ করল। তার নিঃশ্বাস ধীরে এলো। এই স্পর্শ সে চেনে। এটা দাবি নয়, এটা যত্ন।
পূর্ণর হাতটা এবার ধীরে ধীরে নামল তার পায়ের ওপর। উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। যেন দীর্ঘদিনের ক্লান্তি হালকা হয়ে গেল এক মুহূর্তে।
অরণ্যের মনে হলো, এইটুকু থাকলেই অনেক কিছু সহ্য করা যায়।
সে কিছু বলল না। শুধু মাথা একটু কাত করল।
এই ছোট্ট নড়াচড়া, অনেক বড় সম্মতি।
পূর্ণ র আঙুলগুলো ধীরে ধীরে নূপুরের ঘুঙুর ছুঁয়ে চলল। একটার পর একটা। যেন গুনছে, কতটা অপেক্ষা, কতটা না-বলা কথা, কতটা বিশ্বাস জমে আছে এখানে।
প্রতিটি ঘুঙুরের ভেতর একটা গল্প। কোনোটা হাসির, কোনোটা অভিমানের, কোনোটা নিঃশব্দ ভালোবাসার।
বাইরে রাত গাঢ় হচ্ছে। জানালার কাঁচে আলো কাঁপছে। ভেতরে সময় থেমে গেছে। এখানে কোনো তাড়াহুড়া নেই, কোনো ভবিষ্যতের হিসেব নেই। শুধু এই মুহূর্ত। যেখানে হাত কথা বলে, আর মন শুনে।
অরণ্য চোখ খুলে তাকাল পূর্ণের দিকে। সেই চোখে লজ্জা নেই, ভয় নেই, শুধু এক ধরনের শান্ত স্বীকৃতি।
যেন বলছে,
“এইটুকুই যথেষ্ট।”
পূর্ণ তখন বুঝল, ভালোবাসা সবসময় বড় করে বলা লাগে না। কখনো কখনো ভালোবাসা নূপুরের মতো, নড়লেই শব্দ হবে, তাই খুব সাবধানে ছুঁতে হয়।
ঘরের আলো আরও নরম হয়ে এলো। পূর্ণ আর অরণ্যের মাঝখানে অদৃশ্য একটা বন্ধন তৈরি হলো। যেটা উচ্চস্বরে বলা যায় না, কিন্তু ভাঙাও যায় না।
আর সেই নীরব, গভীর সন্ধ্যায় ভালোবাসা সম্পূর্ণ হলো, কোনো শব্দ ছাড়াই।
