দার্জিলিং এ ব্ল্যাকি

দার্জিলিং বললেই চোখে ভাসে কনকনে ঠান্ডা, কুয়াশায় ঢাকা পাইন বন আর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা। কিন্তু আমার দার্জিলিং ভ্রমণের অভিজ্ঞতাটি একটু বেশিই রোমাঞ্চকর আর মজার হয়েছিল এক অনাহূত ব্ল্যাকির সৌজন্যে। ঘটনাটি মল রোডের। বিকেলে কনকনে ঠান্ডায় কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাকিয়ে বেঞ্চে বসেছিলাম। হাতে একটা বড় পেপার কাপে ধোঁয়া ওঠা গরম কফি আর পাশে বিস্কুটের প্যাকেট। কফিতে প্রথম চুমুকটা দেব, ঠিক তখনই কোত্থেকে যেন একটা প্রকাণ্ড, কুচকুচে কালো ও তুলতুলে পাহাড়ি কুকুর এসে আমার একদম পায়ের কাছে বসে পড়ল। তার গায়ে জড়ানো ছিল নীল রঙের একটা পুরোনো স্কার্ফ—বোধহয় কোনো পর্যটক দয়া করে পরিয়ে দিয়ে গেছেন! কুকুরটি তার বড় বড় মায়াবী চোখ জোড়া দিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ভাবলাম বেচারা হয়তো ক্ষুধার্ত। আমি পরম মমতায় বিস্কুটের প্যাকেট থেকে একটা বিস্কুট বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু অবাক কাণ্ড! কুকুরটি বিস্কুটের দিকে একনজর তাকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে একদম নাক সিঁটকালো! এরপর সে তার ডান থাবাটা বাড়িয়ে আলতো করে আমার হাতের কফির কাপটাতে এক ধাক্কা দিল এবং চোখ দিয়ে পেপার কাপটির দিকে ইশারা করল। আমি তো অবাক! পরীক্ষা করার জন্য কফির কাপটা নিচে রাখতেই, সে খুব আয়েশ করে জিভ দিয়ে চেটে চেটে কফি খাওয়া শুরু করল। কফি শেষ করে সে খুব তৃপ্তির ভঙ্গিতে একটা ‘ঘেউ’ ডাক দিল এবং নিজের থাবা দিয়ে মুখ পরিষ্কার করল—ঠিক যেন কোনো অভিজাত ক্যাফেতে বসে সান্ধ্যকালীন ‘কফি ব্রেক’ শেষ করল! এরপর আমার দিকে একটা বিজয়ের হাসি (বা মনে মনে ধন্যবাদ) দিয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে মল রোডের ভিড়ে হাওয়া হয়ে গেল। দার্জিলিংয়ের ঠান্ডা তো হাওয়া হয়েছিলই, সাথে আমার বিকেলের কফিটাও হাওয়া! পরে স্থানীয় এক দোকানদারের কাছে শুনলাম, ওই কুকুরটির নাম নাকি ‘ব্ল্যাকি’ এবং সে নাকি মল রোডের নামকরা কফি-খোর!
কফি ব্রেক’ শেষ করল! এরপর আমার দিকে একটা বিজয়ের হাসি (বা মনে মনে ধন্যবাদ) দিয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে মল রোডের ভিড়ে হাওয়া হয়ে গেল। দার্জিলিংয়ের ঠান্ডা তো হাওয়া হয়েছিলই, সাথে আমার বিকেলের কফিটাও হাওয়া! পরে স্থানীয় এক দোকানদারের কাছে শুনলাম, ওই কুকুরটির নাম নাকি ‘ব্ল্যাকি’ !!! এবং সে নাকি মল রোডের নামকরা কফি-খোর। যাই হোক পাহাড়ের রানি দার্জিলিংয়ের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা প্রকৃতি যেন চোখের পলকে মন ভালো করে দেওয়ার এক জাদুকরী শক্তি বহন করে।!
পরদিন ভোরের সূর্যোদয় দেখতে শেষ রাতে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় উঠে যাত্রা শুরু হয়েছিল টাইগার হিলের দিকে। আঁধার পেরিয়ে যখন পুব আকাশে হালকা আলোর রেখা ফুটল, তখন কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফাবৃত চূড়াগুলোতে প্রথম রোদের ছোঁয়া লাগে। ধাপে ধাপে সাদা বরফ গোলাপি, লাল এবং তারপর খাঁটি সোনালি রঙের মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে। টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার এই রূপ বদল চোখের সামনে দেখা এক অনির্বচনীয় স্বর্গীয় অভিজ্ঞতা।
টাইগার হিল থেকে নেমে সোজা ঐতিহ্যবাহী টয় ট্রেনে চড়ে বাতাসিয়া লুপের উদ্দেশ্যে যাত্রা। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষিত এই পাহাড়ি রেলে চড়ে আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে এগিয়ে যাওয়ার অনুভূতি অতুলনীয়। টয় ট্রেনটি যখন বাতাসিয়া লুপের বৃত্তাকার ট্র্যাকে ঘোরে, তখন জানালায় চোখ রাখলেই দৃশ্যপট বদলে যায়। একদিকে মেঘ ভেসে চলা পাইন বনের পাহাড়, আর অন্যদিকে লুপের কেন্দ্রস্থলে সুসজ্জিত মনমুগ্ধকর রকমারি ফুলের বাগান ও যুদ্ধ স্মারক।
দার্জিলিং ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো এর দিগন্তজোড়া সবুজ চা বাগান। হ্যাপিল্যান্ড বা হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেনে গিয়ে মনে হয় যেন সবুজ গালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে পাহাড়ের ঢালে ঢালে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে চা-পাতা তোলার মনোরম দৃশ্য এবং দূর থেকে ভেসে আসা চায়ের সুবাস এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়।
এরপর পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ঢালু পথ ধরে নেমে চলা ‘রক গার্ডেন’ বা শিলা বনে। বিশাল সব পাথর কেটে তৈরি এই ধাপযুক্ত বাগান এবং তার বুক চিরে বয়ে চলা প্রাকৃতিক ঝরনা সত্যিই নজরকাড়া। পাহাড়ের ওপর থেকে ধাপে ধাপে নেমে আসা ঝরনার কলকল শব্দ আর চারপাশের শীতল পরিবেশ এক নিবিড় অনুভূতির সৃষ্টি করে। একটু নিস্তব্ধতা আর আত্মিক প্রশান্তির খোঁজে যাওয়া যায় জাপানিজ টেম্পল ও পিস প্যাগোডায়। পাইন গাছে ঘেরা নিরিবিলি পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত এই ধবল শুভ্র প্যাগোডার শান্ত পরিবেশ নিমেষেই মনকে এক অন্যরকম অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়। বিকেলের দিকে মল রোডে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘার বিশালতার দিকে তাকিয়ে থাকা আর এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম দার্জিলিং চায়ের আনন্দ শব্দে বোঝানো দায়। চারপাশের সবুজ পাহাড়, মেঘ-কুয়াশার লুকোচুরি আর হিমেল বাতাস—সব মিলিয়ে দার্জিলিংয়ের প্রতিটি কোণেই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য জড়িয়ে আছে, যা স্মৃতির পাতায় চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।