স্বর্গ থেকে একটু দূরে

রাতে খাবার শেষে কিছুটা সময় আমরা পরিবারের সবাই মিলে টিভিতে কোনো নাটক বা সিরিজ দেখতে বসি। সেদিন Crash Landing on You–এর একটি দৃশ্য দেখার সময় আমার বরকে হঠাৎ বলেছিলাম,
“জায়গাটা কোথায়? এত সুন্দর! একবার দেখে আসতে ইচ্ছে করছে।”
সে খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেছিল,
“ভাগ্যে থাকলে যাবে। অসম্ভব কিছু নয়।”
কথাটা তখন হয়তো স্রেফ কথার কথা মনে হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য যে সত্যিই একদিন আমাদের সেই সুযোগ করে দেবে, কে জানত!
গত মে মাসে আমদের ১৪ দিনের জন্য ইউরোপের তিনটি দেশ—জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও ইতালি ভ্রমণের সুযোগ পেয়েছিলাম। আর আজ যে জায়গাটির কথা বলছি, সেটি সুইজারল্যান্ডের বার্নিস ওবারল্যান্ড অঞ্চলের ছোট্ট, অপূর্ব সুন্দর এক গ্রাম—ইসেল্টওয়াল্ড (Iseltwald)।
লেক ব্রিয়েঞ্জের দক্ষিণ তীরে, ইন্টারলাকেনের খুব কাছেই অবস্থিত এই ছোট্ট গ্রামটি যেন কোনো ছবির ভেতর থেকে উঠে আসা এক টুকরো স্বপ্ন।
যেভাবে গিয়েছিলাম
ইউরোপ ভ্রমণের জন্য আমরা Eurail Pass নিয়েছিলাম। এর মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ট্রেনে যাতায়াত করা যায়। বারবার আলাদা টিকিট কেনার পরিবর্তে একবার পাস কিনে নিলে অনেক ক্ষেত্রেই তা সুবিধাজনক হয়।
সুইজারল্যান্ডের জন্য আমরা নিয়েছিলাম Swiss Travel Pass, যার মাধ্যমে দেশটির বিভিন্ন ধরনের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করার সুবিধা পাওয়া যায়।
জার্মানির ভ্রমণ শেষ করে আমরা ট্রেনে সরাসরি চলে আসি সুইজারল্যান্ডের Lauterbrunnen-এ। সেখান থেকে বাসে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও আমরা বেছে নিয়েছিলাম নৌপথ। Lake Brienz-এর ক্রুজ বোটে করে রওনা হলাম ইসেল্টওয়াল্ডের উদ্দেশে। এর জন্য আলাদা টিকিট করতে হয়নি—আমাদের Swiss Travel Pass-এর মধ্যেই এটি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ক্রুজ বোটে বসে চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি যেন নিজের হাতে এঁকে রাখা কোনো ছবি সামনে মেলে ধরেছে। একদিকে আল্পসের সুউচ্চ পাহাড়, অন্যদিকে লেক ব্রিয়েঞ্জের স্বচ্ছ নীল-সবুজ, টারকোয়েজ জলরাশি। আর সেই জল কেটে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা আমাদের ক্রুজ বোট।
ইসেল্টওয়াল্ডের অনেক ছবি ও ভিডিও আমি এর আগে দেখেছি। তাই জায়গাটি সম্পর্কে একটা ধারণা ছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছে বুঝলাম—কিছু সৌন্দর্য শুধু চোখ দিয়ে দেখার নয়, অনুভব করারও।
ইসেল্টওয়াল্ড ঠিক তেমনই এক সৌন্দর্য, যাকে যতটা দেখা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি অনুভব করা যায়। চারপাশের নীরবতা, পাহাড়ের সবুজ ঢাল, স্বচ্ছ হ্রদের জল আর ছোট্ট গ্রামের শান্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর ব্যস্ততা থেকে অনেক দূরে কোনো এক স্বপ্নের রাজ্যে চলে এসেছি।
গ্রামের একদিকে আল্পস পর্বতমালার মনোরম দৃশ্য, অন্যদিকে লেক ব্রিয়েঞ্জের স্ফটিকস্বচ্ছ জল। তীরে সারি সারি ঐতিহ্যবাহী সুইস কাঠের বাড়ি—Chalets, ছোট্ট লেকসাইড ক্যাফে, আর উপদ্বীপের ডগায় দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক Schloss Seeburg—সবকিছু মিলিয়ে ইসেল্টওয়াল্ড যেন এক নিখুঁত পোস্টকার্ড।
সেখানে দাঁড়িয়ে বারবার মনে হচ্ছিল,
“এখান থেকে কি সত্যিই ফিরে যেতে হবে?”
সত্যি বলতে, ফিরে আসার সময় মনটা কিছুতেই মানতে চাইছিল না। মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট গ্রামটার শান্ত সৌন্দর্যের মধ্যে যদি আরও কিছুটা সময় থেকে যেতে পারতাম!
সেদিন রাতে Crash Landing on You দেখতে দেখতে যে প্রশ্নটা করেছিলাম—
“জায়গাটা কোথায়? এত সুন্দর!”
তার উত্তর যেন কয়েক মাস পর নিজের চোখেই পেয়ে গেলাম।
কিছু ইচ্ছে হঠাৎ করে পূরণ হয় না। সময় লাগে, অপেক্ষা লাগে, আর কখনো কখনো শুধু ভাগ্যের ওপর একটু ভরসা রাখতে হয়।
কারণ, কিছু কিছু জায়গায় যাওয়া সত্যিই ভাগ্যে লেখা থাকে।