জাতিস্মরের চিঠি

জাতিস্মরের চিঠি পুরোনো কলকাতার একটা গলি। নাম ‘শঙ্কর ঘোষ লেন’। এখানকার পুরোনো বাড়িগুলোর দেওয়ালে সময় যেন আষ্টেপৃষ্টে আটকে আছে। এই বাড়িরই দোতলার একটি ঘরে বাস করেন অরিন্দমবাবু। বয়স ষাটের কোঠায়, কিন্তু চেহারায় একটা অদ্ভুত ক্লান্তি আর দূরত্বের আবেশ। অরিন্দমবাবুর জীবনটা বড় হিসেবী। ঘড়ি ধরে খাওয়া, নিয়ম করে অফিস যাওয়া, আর সন্ধ্যাবেলায় বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে ম্রিয়মাণ আলোয় খবরের কাগজ পড়া। কিন্তু এই হিসেবী মানুষটার ভেতরেই যেন এক অদ্ভুত ‘আলেয়া’ রোজ রাতে ঘুরে বেড়ায়। যখনই চারপাশ নিঝুম হয়ে আসে, অরিন্দমবাবু টের পান—তিনি শুধু বর্তমানের অরিন্দম নন। তাঁর ভেতরে জেগে ওঠে এক অন্য সত্তা, যেন গতজন্মের কোনো জাতিস্মর। সেদিন রাতে হঠাৎই একটা ঝড় উঠল। জানালার কাঁচগুলো কেঁপে উঠল থরথর করে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর মোমের আলোয় ঘরের ছায়াগুলো কেমন যেন দীর্ঘ হতে লাগল। তখনই ঘরের কোণে রাখা বহুদিনের পুরোনো কাঠের সিন্দুকটার দিকে চোখ পড়ল অরিন্দমবাবুর। সিন্দুকটা জীবনে কখনো তিনি খোলেননি, চাবিটাও হারিয়ে গিয়েছিল কোথায় কে জানে। আজ হঠাৎ মনে হলো, ওটার ভেতর যেন কে তাঁকে ডাকছে। হাঁটু গেয়ে সিন্দুকের সামনে বসলেন তিনি। একটু ধাক্কা দিতেই আজ কৌতূহলবশত জং ধরা হুড়কোটা খুলে গেল। ভেতরে জমাট বাঁধা ধুলোর নিচে পড়ে রয়েছে কিছু হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠি আর একটা ফ্রেমে বাঁধানো পুরোনো ছবি। মোমের আলোয় ছবিটা তুলে ধরতেই অরিন্দমবাবুর বুকটা কেঁপে উঠল। এ কার মুখ? এই চোখ দুটো তো তাঁর নিজেরই চেনা! অথচ পরনের পোশাক আর চারপাশের পরিবেশ ব্রিটিশ আমলের কোনো অভিজাত ড্রয়িংরুমের। চিঠির বান্ডিলটা উল্টে দেখতেই একটা চিঠি খোলার পর তাঁর চোখ আটকে গেল হাতের লেখায়। কালি কিছুটা ম্লান, কিন্তু শব্দগুলো স্পষ্ট: ”অরিন্দম, তুমি তো বলেছিলে আমরা আবার ফিরব। ঠিক এই অকালবোধনের সময়েই তোমায় খুঁজে নেব আমি। নিয়মের বেড়াজাল বা হিসেবী জীবন আমাদের আলাদা করতে পারবে না…” চিঠির নিচে কোনো নাম নেই, শুধু একটা ছোট মোমের ছাপ। বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়া হু হু করে বইছে। অরিন্দমবাবু বুঝতে পারলেন, রোজ রাতে তাঁর মনে যে চেনা গন্ধটা ভেসে ওঠে, যে অচেনা সুরটা তাঁকে ব্যাকুল করে—তা কোনো ভুল নয়। স্মৃতির ধুলো সরিয়ে সেই পুরোনো প্রতিশ্রুতিই আজ তাঁকে আবার জাগিয়ে তুলেছে। তিনি মৃদু হাসলেন। হিসেবী আলেয়া আজ আর পথভ্রান্ত নয়, সে যেন অবশেষে তার কাঙ্ক্ষিত ঠিকানাকে চিনে ফেলেছে।———